অনলাইন বাজারে চীনা পণ্যের চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে স্থানীয় সংযোজন

এক সময় চীনা পণ্যের মান নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে সংশয় থাকলেও অনলাইন কেনাকাটার প্রসারে সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। সাশ্রয়ী দাম, সহজলভ্যতা ও বৈচিত্র্যের কারণে দেশে অনলাইন বাজারে চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

মোবাইল অ্যাকসেসরিজ ও বিভিন্ন গ্যাজেটের পাশাপাশি চীনা ব্র্যান্ডের টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি ও ওয়াশিং মেশিনের মতো হোম অ্যাপ্লায়েন্সেও ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চীন থেকে যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল এনে দেশে সংযোজন করা পণ্যের সরবরাহও বাড়ছে।

দেশের অন্যতম ই-কমার্স প্লাটফর্ম পিকাবুর তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্লাটফর্মে প্রায় আট হাজার পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ সরাসরি চীন থেকে তৈরি হয়ে আসে। আর প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্যই বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করা হয়, যার যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের প্রধান উৎস চীন। টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এসি ও ওয়াশিং মেশিনের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন গ্যাজেট এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে।

পিকাবুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোরিন তালুকদার এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিকাবু সরাসরি পণ্য আমদানি বা প্রস্তুত করে না। দেশীয় ব্র্যান্ড ও প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে। তবে বাজারে বর্তমানে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ পণ্যই চীন থেকে আসা অথবা স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা।’

তিনি বলেন, ‘হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পণ্য দিতে পারায় হায়ারের মতো ব্র্যান্ড ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

পিকাবুর তথ্য অনুযায়ী, প্লাটফর্মটিতে প্রায় ২৬টি ক্যাটাগরিতে ৮ হাজারের মতো পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি চীন থেকে আসা তৈরি পণ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করা হয়। এসব পণ্যের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের বড় অংশ আসে চীন থেকে। স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা পণ্যের মধ্যে টিভি, ফ্রিজ, এসি ও ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা বেশি। এরপর রয়েছে মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ স্পিকার, পাওয়ার ব্যাংক ও হেডফোনের মতো গ্যাজেট।

মোরিন তালুকদার বলেন, এক সময় চীনা পণ্যের মান নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে দিতে পারাই চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সাফল্যের অন্যতম কারণ। সমমানের অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় এসব পণ্যের দামে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে। তৈরি পণ্যের তুলনায় যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে অ্যাসেম্বল করলে করের দিক থেকেও সুবিধা পাওয়া যায়। এ কারণে স্থানীয় অ্যাসেম্বলির প্রবণতা বাড়ছে।

অন্যদিকে ই-কমার্স প্লাটফর্ম অথবা ডটকমের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার তাসফিন আলম মনে করেন, ২০২৩ সাল থেকে চীনা পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরো স্পষ্টভাবে বাড়তে শুরু করেছে। তার মতে, অনলাইন বাণিজ্যের প্রসারে এসব পণ্যের সহজলভ্যতা বাড়ায় ক্রেতারা প্রথমে কম দামের পণ্য দিয়ে ব্যবহার শুরু করেন। পরে পণ্যের স্থায়িত্ব ও মান প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হওয়ায় চীনা পণ্যের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে।

খন্দকার তাসফিন আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরুতে মানুষের মধ্যে একটি ধারণা ছিল—চায়না পণ্য মানেই সস্তা বা নিম্নমানের পণ্য। অনলাইন কমার্সের কারণে পণ্যগুলো সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ প্রথমে কম দামের পণ্য কিনে ব্যবহার করে দেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস টিকবে বলে কেনা পণ্য এক-দুই বছর ভালো সেবা দিয়েছে। এতে ধীরে ধীরে আস্থা বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘চীনা পণ্যের বৈচিত্র্যও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। নতুন ও ট্রেন্ডি পণ্য দ্রুত বাজারে আনতে পারায় চীনা পণ্যের উপস্থিতি অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে বাড়ছে। পাশাপাশি চীন থেকে পণ্য আমদানিকারক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ায় ভালো মানের পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে।’

অথবা ডটকমে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ নিবন্ধিত পণ্য রয়েছে। সারা দেশের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বিক্রেতা প্লাটফর্মটির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছেন। মোট পণ্যের আনুমানিক ২০ শতাংশ চীনা পণ্য। এর মধ্যে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দামের হেডফোন, চার্জার, কেবল, ব্লুটুথ স্পিকার, ওয়্যারলেস চার্জার, ফিটব্যান্ড ও ডিজিটাল ঘড়ির মতো মোবাইল অ্যাকসেসরিজের চাহিদা বেশি।

খন্দকার তাসফিন আলম জানান, বড় হোম অ্যাপ্লায়েন্সে এখনো দেশীয় ব্র্যান্ডের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তার প্লাটফর্মে ভিশন ব্র্যান্ডের পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। তবে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের পণ্যে হায়ার কিছুটা বাজার তৈরি করেছে এবং টিসিএলের মতো চীনা ব্র্যান্ডও ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ক্ষেত্রে সরাসরি তৈরি পণ্য আমদানি হোক কিংবা চীন থেকে সিকেডি বা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এনে দেশে অ্যাসেম্বল করা হোক—উভয় ক্ষেত্রেই মূল উপকরণের বড় অংশ আসে চীন থেকে। ফলে স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা হলেও এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের ওপর নির্ভরতা থাকছে।

অথবা ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রেতারা সাধারণত আগেই চীন থেকে পণ্য এনে দেশে মজুদ রাখেন। ফলে অর্ডারের পর ঢাকার মধ্যে এক-দুই দিন এবং ঢাকার বাইরে তিন থেকে পাঁচদিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

দেশের অনলাইন বাজারে দারাজ, পিকাবু, অথবা, চালডাল ও রকমারিসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে ইলেকট্রনিক, মোবাইল ও গ্যাজেট, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ফ্যাশন, গৃহস্থালি পণ্য, খাবার ও বই বিক্রি হচ্ছে। এসব প্লাটফর্মে চীনা পণ্যের মধ্যে মোবাইল অ্যাকসেসরিজ ও ছোট গ্যাজেটের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। বড় পণ্যের বাজারেও চীনা ব্র্যান্ডের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে।

চীনা পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা পণ্যের সরবরাহ বাড়ার বিষয়টিকে বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তৈরি পণ্যের তুলনায় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানি করে দেশে সংযোজনের ক্ষেত্রে ব্যয় ও শুল্ক সুবিধা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ প্রবণতা আরো বাড়তে পারে।

মোরিন তালুকদার বলেন, ‘গ্রাহকদের কেনাকাটার অভ্যাসও দ্রুত বদলাচ্ছে। মানুষ অনলাইনে কেনাকাটায় আগের তুলনায় বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ফলে প্রতি বছর বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি ই-কমার্স খাতেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

চীনা পণ্যের উপস্থিতি শুধু পিকাবু ও অথবা ডটকমেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বড় অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে দারাজ, আজকেরডিল, প্রিয়শপ, বিডিশপ, স্টার টেক, রায়ান্স কম্পিউটারস ও গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানও ইলেকট্রনিকস, গ্যাজেট, কম্পিউটার পণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করছে। এসব প্লাটফর্মে চীনা ব্র্যান্ডের তৈরি পণ্যের পাশাপাশি চীন থেকে যন্ত্রাংশ বা উপকরণ এনে দেশে সংযোজন করা পণ্যও রয়েছে। ফলে অনলাইন বাজারে চীনা পণ্যের সরবরাহ এখন শুধু সরাসরি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় সংযোজনের মাধ্যমেও এর পরিধি বাড়ছে।

আরও